
: বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, বর্তমান সংকটকালে তিনি তার অসুস্থ মায়ের পাশে থাকতে চান, কিন্তু দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত পুরোপুরি তার নিজের হাতে নেই। কেন এই সিদ্ধান্ত তার একক নিয়ন্ত্রণে নেই, সে বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগও তার সীমিত। শনিবার (২৯ নভেম্বর) নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া এমন বক্তব্য প্রকাশের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে-আসলে কোন বাধা তার দেশে ফেরাকে আটকে রেখেছে?
অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানিয়েছেন, তারেক রহমানের দেশে ফেরায় সরকারের কোনো বাধা বা আপত্তি নেই। তবে বিষয়টি বিএনপির নেতারা খোলাখুলি ব্যাখ্যা করতে চান না। এক সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, উনি নিজেই ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন, এরপর আমার বলার কিছু নেই। এখানে আমার মতামত জরুরি নয়।”
বিএনপি নেতারা বলছেন, তারেক রহমানের দেশে ফেরার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক, নিরাপত্তাজনিত এবং পরিবেশগত নানা প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, যা খোলাখুলিভাবে বলা সম্ভব নয়। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিতিশীল অবস্থা, উগ্রবাদী সংগঠনগুলোর তৎপরতা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্বল অবস্থান এবং সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় না নিয়ে শুধু আবেগ দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। তাদের মতে, খালেদা জিয়ার পরে দলের একমাত্র ভরসা তারেক রহমান, তাই তার দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত অত্যন্ত হিসাবি ও সতর্কতার সঙ্গে নিতে হবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, “উনি যে কথা বলেছেন, তা ঠিকই বলেছেন। অনেক ধরনের বাধা আসতে পারে—সেটা সবাই বোঝেন। তাই খোলাসা করে বলা হয়নি।” নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক স্থায়ী কমিটির সদস্য বলেন, দেশে নানা ধরনের ঘটনা ঘটছে। উগ্রবাদী সংগঠন, মব, অস্থিতিশীলতা-সবই রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অবস্থাও দুর্বল। এ পরিস্থিতিতে তিনি দেশে এলে যদি কিছু ঘটে? তাহলে দলেরই বা কী হবে? দেশের কী হবে? এখন নেতৃত্বের ভরসা একজনই-তারেক রহমান।”
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আইনি প্রক্রিয়ায় তারেক রহমানের বিরুদ্ধে থাকা সব মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। সে সময় তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান দেশে এসেছিলেন। বিএনপি একাধিকবার জানিয়েছে, নির্বাচনের আগেই দেশে ফিরবেন তারেক রহমান। ইতোমধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হবে বলে ঘোষণা এসেছে। বগুড়া-৬ আসনে তাকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবেও মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে নিরাপত্তা দিতে বুলেটপ্রুফ গাড়ি কেনা এবং অস্ত্রের লাইসেন্সের আবেদনও করেছে দলটি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের দেশে ফেরা শুধুই পারিবারিক বা মানবিক বিষয় নয়; এটি বহুমাত্রিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নির্বাচন-সংক্রান্ত উত্তেজনা, আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা এবং আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর অবস্থান-সব মিলিয়ে বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। তাই তার দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে ব্যক্তিগত অনুভূতি, দলীয় কৌশল এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অঙ্গনের ভারসাম্যের ওপর।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, “তারেক রহমানের দেশে ফেরার বিষয়টি ব্যক্তিগত নয়, রাজনৈতিক। এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। একজন সন্তানের মানসিক অবস্থা আমরা বুঝতে পারি, কিন্তু এখনই তার একক সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়। সিদ্ধান্তটি দলের প্রয়োজন, দেশীয় এবং আঞ্চলিক রাজনৈতিক অবস্থার ওপর নির্ভর করবে। জাতীয় ও বৈশ্বিক রাজনীতির সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশের নেতৃত্বের বোঝাপড়া থাকে-যা কখনো নেতৃত্বের সংকট তৈরি করে, আবার ভবিষ্যৎও নির্মাণ করে।”




