
নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজশাহীর তিনটি সংসদীয় আসনে বিএনপির প্রার্থী বদলের দাবিতে মাঠ ছাড়ছেনা মনোনয়ন বঞ্চিতদের অনুসারীরা। তারা লাগাতার আন্দোলন করছেন। ফলে এসব আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থীরা দলের একাংশের নেতাকর্মীদের অসহযোগিতার মুখে নির্বাচনী কর্মকাণ্ড চালাতে ঠিকমতো মাঠে নামতে পারছেন না। জেলার ছয়টি আসনের মধ্যে রাজশাহী-১, রাজশাহী-৩ ও রাজশাহী-৫ আসন ঘিরে উত্তেজনা সবচেয়ে বেশি।
গত ৪ নভেম্বরের পর থেকেই এই তিনটি আসনে কোথাও মশাল মিছিল, কোথাও মহাসড়ক অবরোধ, আবার কোথাও কাফনের কাপড় পরে সড়কে শুয়ে প্রার্থী বদলের দাবি তুলছেন মনোনয়ন বঞ্চিতদের কর্মীরা। পরিস্থিতি সামাল দিতে কেন্দ্রীয় বিএনপি নেতারা মনোনয়নবঞ্চিতদের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করলেও বিশেষ পরিবর্তন আসেনি। মাঠের অচলাবস্থা কাটাতে তৃণমূল নেতাকর্মীরা দ্রুত কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর)
রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) আসনে বিএনপি মনোনয়ন দিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাবেক সামরিক সচিব মেজর জেনারেল (অব.) শরিফ উদ্দিনকে। তিনি প্রয়াত মন্ত্রী ব্যারিস্টার আমিনুল হকের ভাই। জনপ্রিয় এই পরিবারের প্রতি জনগণের আস্থা কাজে লাগিয়েই শরিফ উদ্দিন নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদেরও একটি বড় অংশ তাকে শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে দেখছেন।
তবে মনোনয়নবঞ্চিত অ্যাডভোকেট সুলতানুল ইসলাম তারেকের অনুসারীরা প্রার্থী পরিবর্তনের দাবিতে লাগাতার আন্দোলনে রয়েছেন। সর্বশেষ গত শনিবার তারা কাফনের কাপড় পরে রাস্তার উপর শুয়ে পড়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-ঢাকা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। তাদের দাবি- শরিফ উদ্দিন মাঠের রাজনীতিতে নতুন এবং তার প্রার্থীতায় জামায়াতের প্রার্থী সুবিধা পেতে পারেন।
জিয়া মঞ্চ নামের বিএনপিপন্থী একটি সংগঠনের রাজশাহী জেলা শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবুল হোসেন বলেন, ‘‘দেশের রাজনীতির পট পরিবর্তনের পরে তিনি রাজনীতির মাঠে নেমেছেন। তার সঙ্গে যারা আছেন তাদের মানুষ পছন্দ করেন না। তাদের অনেকেই আওয়ামী লীগের দোষর, দখলবাজ, চাঁদাবাজ ও মাদক সিন্ডিকেটের সদস্য। তাই পতিত সরকারের জুলুম নির্যাতনে যে নেতা কর্মীদের পাশে ছিলেন, দলকে গুছিয়ে রেখে ছিলেন সেই ত্যাগী নেতাকেই প্রার্থী হিসেবে আমরা দেখতে চাই।’’
অ্যাডভোকেট সুলতানুল ইসলাম তারেকে বলেন, ‘‘নেতাকর্মীরা যখন আন্দোলনে নামেন চেষ্টা করেও তখন তাদের নিবৃত করতে পারা যায় না; কারণ তৃণমূলের দাবিই হচ্ছে জনপ্রিয় প্রার্থীকে বেছে নেওয়া। তাই দলের হাই কামান্ডের উচিত তৃণমূলের দাবির প্রতি সম্মান জানানো।’’
রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর)
রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনেও মনোনয়ন বঞ্চিতদের উদ্বেগ তীব্র। রায়হানুল আলাম রায়হানের অনুসারীরা মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট শফিকুল হক মিলনকে ‘বহিরাগত’ উল্লেখ করে তার মনোনয়ন বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ-অবরোধ চালাচ্ছেন। সর্বশেষ তারা পবা উপজেলার খড়খড়িতে রাস্তার উপর শুয়ে পড়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-ঢাকা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। তাদের দাবি স্থানীয় প্রার্থীর।
রায়হানুল আলম রায়হানের ভাষ্য- ‘‘এলাকার মানুষ এমন প্রার্থী চান যাকে বিপদের সময় কাছে পাওয়া যায়, তাই স্থানীয় প্রার্থীই হতে হবে তাদের সংসদ সদস্য।’’
রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দুর্গাপুর)
রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দুর্গাপুর) আসনে মনোনয়ন ঘোষণার পর থেকেই উত্তেজনা চরমে। নজরুল ইসলাম মণ্ডলকে প্রার্থী করা হলে ১২ মনোনয়নপ্রত্যাশীর অধিকাংশই তার বিরোধিতায় মাঠে নেমেছেন। বিশেষ করে আবু বকর সিদ্দিক, গোলাম মোস্তফা, রোকনুজ্জামান আলম, ইসফা খাইরুল হক, জুলকার নাইম মোস্তফার অনুসারীরা যৌথভাবে প্রায় প্রতিদিনই মহাসড়ক অবরোধ, মশাল মিছিল ও সমাবেশ করছেন। সর্বশেষ গত শনিবার দুর্গাপুরে তারা একমঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রার্থী পরিবর্তনের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। এর আগের দিন গত শুক্রবার তারা মশাল হাতে বড় শো-ডাউন দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে মহাসড়ক অবরোধ করে।
তাদের অভিযোগ, দল দীর্ঘদিন নির্যাতন-জেল-হুলিয়া সহ্য করে দলের পাশে থাকা নেতাদের বাদ দিয়ে জনবিচ্ছিন্ন একজনকে মনোনীত করেছে। এতে তৃণমূলে ক্ষোভ বাড়ছে এবং নির্বাচনী মাঠেও মনোনীত প্রার্থী বাধার মুখে পড়ছেন। তবে এ আসনে মনোনয়নবঞ্চিত আব্দুস সাত্তার ও মাহমুদা হাবিবার অনুসারীরা দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণায় নেমেছেন।
দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও পুঠিয়া উপজেলার বিএনপির আহবায়ক আবু বকর সিদ্দিক বলেন, ‘‘যেহেতু তৃণমূল নেতাকর্মীরা প্রার্থী বদলের দাবিতে আনোলন করছে তাই দলের উচিত নিরপেক্ষ জরিপের মাধ্যমে জনপ্রিয়তা যাচাই করে যোগ্য ও উপযুক্ত প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া। দলকে নেতাকর্মীদের মনের ভাষা বুঝতে হবে।’’
রাজশাহীর তিনটি আসনে বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংকট যত সময় যাচ্ছে ততই ঘনীভূত হচ্ছে। কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকলেও এখনো কোনো পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে না, ফলে নির্বাচনী মাঠে অনিশ্চয়তা দীর্ঘায়িত হচ্ছে।




